প্রমিতি রায়ের প্রতিবেদন; খড়দহ, ১৫ জানুয়ারি। আধুনিক ও আধ্যাত্মিক রহড়ার রূপকার ছিলেন কর্মযোগী সন্ন্যাসী স্বামী পুণ্যানন্দজী মহারাজ। তাঁর ১২৩ তম জন্মদিন পালিত হল পুণ্যানন্দ বিষয়ক গীতি আলেখ্য এবং পটচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে। 'খড়দহ সংস্কৃতি অঙ্গন' বিগত এক দশকের বেশি সময় ধরে পুণ্যানন্দ জয়ন্তী পালন করে এসেছে এবং সেই সঙ্গে পিঠেপুলির উৎসব। এদিনও ছিল সকলের জন্য ছিল পিঠেপুলির আয়োজন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, মহারাজ এলাকার মানুষকে নানান উৎসবে খাওয়াতে ভালোবাসতেন। মহারাজের স্মৃতিচারণ করেন বারাকপুর রামকৃষ্ণ বিবেকানন্দ মিশনের সহ-সম্পাদক শ্যামল দাস এবং বালকাশ্রম উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক অমিত কুমার রায়।
এদিকে 'দেশের মাটি কল্যাণ মন্দির'-এর সদস্যরা নানান অবকাশে নিয়মিত পুণ্যানন্দ স্মরণ করে থাকেন। সেই সঙ্গে রহড়া-খড়দহের ইতিহাস চর্চাও তারা করেন। এদিন সন্ধ্যায় 'দেশের মাটি'-র সদস্যরা ভাবগম্ভীর পরিবেশে উপস্থাপন করলেন গীতি আলেখ্য 'পুণ্যশ্লোক পুণ্যানন্দ'। আলেখ্যটি সংকলন ও সম্পাদনা করেছেন খড়দহের ভূমিপুত্র তথা স্বামী পুণ্যানন্দের জীবনীকার অধ্যাপক ড. কল্যাণ চক্রবর্তী। সঙ্গীত শিল্পীরূপে উপস্থিত ছিলেন দেবকুমার কর্মকার, প্রমিতি রায়, রূপালী বর্মন এবং সৌগত অধিকারী। বাচিক শিল্পী ছিলেন ডঃ রুবেল পাল, ডঃ উৎপল কুমার উত্থাসনী, সুমনা মুখোপাধ্যায় এবং ছন্দা হালদার।
সংস্কৃত ভাষায় আলেখ্য পরিচিতি দিয়ে সঞ্চালনা করেন ড. রুবেল পাল। তার সহজ ও উদাত্ত কণ্ঠে সংস্কৃত উচ্চারণ দর্শক মণ্ডলীকে সম্পৃক্ত করেছে। পুণ্যানন্দজীর সংস্কৃত ভাষাশিক্ষা সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহ ছিল, তাই সংস্কৃতকে বিশেষ মর্যাদা দিয়ে কিছুটা অংশ সংস্কৃতে পরিবেশিত হয়েছে বলে জানিয়েছেন দেশের মাটি কল্যাণ মন্দিরের সম্পাদক মিলন খামারিয়া। খড়দহ সংস্কৃতি অঙ্গনের সম্পাদক সুব্রত দেবনাথ এই প্রতিনিধিকে জানান, স্বামী পুণ্যানন্দের জীবন কাহিনী নিয়ে এদিন পরিবেশিত হয়েছে পটচিত্র, যা সত্যিই এক অন্যতর মাত্রা দিয়েছে। 'শ্রুতিজাতক' সংগঠনের পিউ বিশ্বাস দাস পটচিত্রের গান গেয়েছেন।
১৯৪৪ সালের ১৬ আগস্ট শ্রী রামকৃষ্ণের পট স্থাপন করে রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের আধ্যাত্মিক উদ্বোধন হয়। পরে সেই বছরই পয়লা সেপ্টেম্বর দীনদুঃখী বালক নারায়ণ রূপে প্রকৃত উদ্বোধিত হয়ে শ্রীরামকৃষ্ণদেব এলেন বালকাশ্রমে। ঠাকুর-মা-স্বামীজীর ছবি বসিয়ে বিশেষ পুজো, হোম ও প্রার্থনার মধ্যে দিয়ে আধ্যাত্মিক উদ্বোধন করেছিলেন মঠ ও মিশনের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক স্বামী মাধবানন্দজী মহারাজ। ১৬ই আগষ্ট এবং ১ লা সেপ্টেম্বর -- এই যুগপৎ বোধনে বালকাশ্রমের বুনিয়াদ সুদৃঢ় হয়েছে। শুরু হয়েছিল ৩৭ জন অনাথ বালককে নিয়ে পথ চলা। এই আশ্রমই আজ শিক্ষাজগতে মহীরূহ আকার ধারণ করেছে। আশ্রমের প্রথম কর্মসচিব ছিলেন স্বামী পুণ্যানন্দ।
১৯০৪ সালের ১৫ ই জানুয়ারি পৌষ পার্বনের দিন স্বামীজীর জন্ম, ঢাকার কাছে শিমূলিয়া গ্রামে। তিনি ছিলেন সৌম্য, স্থিতধী, প্রশান্ত-মুখ, গৈরিক বসনধারী এক উচ্চশির সন্ন্যাসী। তিনি রেঙ্গুনের রামকৃষ্ণ মিশনে কাজ করতে গিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা দেখেছেন। দেখেছেন বাংলায় পঞ্চাশের মন্বন্তর, মৃত্যুর মহামিছিল। ১৯৪৪ সালে তিনি দায়িত্ব পেলেন রহড়া বালকাশ্রমের। আর একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অঙ্কুর নিজ হাতেই মহীরুহ করে গেলেন। রহড়া-খড়দহের মানুষ দেখতে পেলেন শিক্ষা ব্যবস্থা ও প্রশাসন কেমন হওয়া উচিত। তাঁরই প্রেরণায় গোটা এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে শিক্ষানুরাগ। খড়দহের নাট্যচর্চা, সঙ্গীত সাধনা, ক্রীড়ামোদ তাঁরই সক্রিয়তার ফসল। তিনি লোকসংস্কৃতির চর্চা করিয়েছেন এলাকায়। বালকাশ্রমে কবিগান, কীর্তন, তর্জা, লোকসঙ্গীতের নানান আসর বসতো উৎসবের দিনগুলিতে। পরবর্তীকালে এই বিরল চর্চা অনুসরণ করতে শুরু করেন খড়দহের শিষ্ট সংস্কৃতির ধ্রুপদী ধারার মানুষ।
এদিন মহারাজের পছন্দের গান ও নৃত্যের আসর বসেছিল। সঙ্গীত পরিবেশন করেন অরুণ কুমার মিত্র, দেবশী ভদ্র, তিতিক্ষা দাস; নৃত্য পরিবেশন করেন বিশাল রাজবংশী। অনুষ্ঠানের আহ্বায়ক ছিলেন প্রাক্তন শিক্ষক প্রদীপ কুমার ভদ্র। অনুষ্ঠানের পশ্চাতে অভিভাবকের মতো দাঁড়িয়ে ছিলেন পীযূষ দেব, সুজিত মুখার্জি প্রমুখ ব্যক্তিত্ব। দুই সঞ্চালক ছিলেন সুমিতা সরকার এবং উদিত চক্রবর্তী। সব মিলিয়ে অনুষ্ঠান 'পূর্ণপুণ্য: পূর্ণানন্দে পুণ্যানন্দ' সার্থক হয়েছে, সমবেতভাবে জানালেন উপস্থিত দর্শক ও শ্রোতৃমণ্ডলী।
Comments
Post a Comment