গোপাষ্টমীতে দেশি গরু পালনের বার্তা দিল ভারতীয় কিষাণ সংঘ



পারুল খামারিয়া, স্বচ্ছ বার্তা - কলকাতা, ৩০ অক্টোবর; জগদ্ধাত্রী পুজোর অষ্টমী তিথিতে দেশ জুড়ে গোপাষ্টমী পালন করল ভারতীয় কিষান সংঘ। কার্তিক মাসের শুক্লা অষ্টমী তিথিতেই ভগবান কৃষ্ণের পালক-পিতা নন্দ তাঁকে বৃন্দাবনের গরুর দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। এই দিনে কৃষ্ণ ও বলরামকে বাছুরের যত্ন নেওয়ার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কৃষ্ণ ও বলরাম উভয়েই তাদের পঞ্চম বর্ষে উত্তীর্ণ হওয়ার পর ছেলেদের চারণভূমিতে গরুগুলির দায়িত্ব দিতে সম্মত হন তিনি। নন্দ মহারাজ বৃন্দাবনে প্রথমবার গরু চরাতে যাওয়ার সময় কৃষ্ণ ও বলরামের জন্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেন।

 ভগবান কৃষ্ণের ঐশ্বরিক সহধর্মিণী রাধাও গরু চরাতে চেয়েছিলেন কিন্তু মেয়ে হওয়ায় তাঁর কথা অস্বীকার করা হয়েছিল। তাই, তিনি সুবাল-সখার সাদৃশ্যের কারণে ছেলের ছদ্মবেশ ধারণ করেছিলেন, তিনি তাঁর ধুতি ও পোশাক পরেছিলেন এবং মজা করার জন্য তার সঙ্গীদের সাথে গো-পালনের জন্য কৃষ্ণের সাথে যোগ দিয়েছিলেন। এই দিনই ভগবান শ্রীকৃষ্ণ রাধার চরণ কোমল দর্শন করেছিলেন। 

এইদিনে ভক্তরা গোশালা পরিদর্শন করেন, গরু ও গোশালা পরিষ্কার করেন। ভক্তদের দ্বারা বিশেষ আচার প্রদানের আগে গরুকে কাপড় ও গহনা দিয়ে সজ্জিত করা হয়। সুস্বাস্থ্যের জন্য বিশেষ পশুখাদ্য খাওয়ানো হয় এবং এর সংরক্ষণের জন্য বিশেষ অভিযানের আয়োজন করা হয়। এইদিনে, ভাল ও সুখী জীবনের জন্য, আশীর্বাদ অর্জনের জন্য প্রদক্ষিণ সহ কৃষ্ণপূজা ও গো-পূজা করা হয়। ভক্তরাও দৈনন্দিন জীবনে গরুর উপযোগিতার জন্য বিশেষ সম্মান প্রদর্শন করে। তারা সবাই গরুকে খাওয়ান এবং গোশালার কাছে ভোজে অংশ নেন। ভক্তদের বিশ্বাস - এমন করলে অন্ন কষ্ট ও আর্থিক সমস্যা দূর হয়।

 আবার অন্যদিকে, গোপাষ্টমী কৃষিকাজের গ্রামীণ ঐতিহ্যের সঙ্গে যুক্ত। গোপাষ্টমী কৃষিকাজের একটি উদ্‌যাপন এবং একটি গ্রামীণ ঐতিহ্য। এটি মূলত ব্রজ থেকে উদ্ভূত হয়েছিল এবং অন্যান্য অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে। যখন ভগবান কৃষ্ণ ইন্দ্রের পুজোর বিরোধিতা করেছিলেন এবং নন্দ বাবাকে তাঁর পুজো বন্ধ করতে বাধ্য করেছিলেন, তখন নন্দ বাবা সহ সকলেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন যে ইন্দ্রের পরিবর্তে কাকে পুজো করা উচিত। এরপর ভগবান কৃষ্ণ তাঁদের প্রকৃতির উপাদানগুলির পুজো করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি শারদ পূর্ণিমার চাঁদকে পবিত্র ঘোষণা করেছিলেন, যা ঔষধি ভেষজগুলিতে সার যোগান দেয়।

তিনি সূর্য, চন্দ্র, যমুনা, গোবর্ধন এবং গরুর পুজোর নির্দেশ দিয়েছিলেন। তিনি সূর্য দেবতাকে উপাসনার যোগ্য ঘোষণা করেছিলেন। তিনি যম দ্বিতীয়ায় পালিত যমুনা নদীকেও পবিত্র ঘোষণা করেছিলেন। তিনি গোবর্ধন পুজোর ঐতিহ্য শুরু করেছিলেন। তিনি ক্ষেত এবং নতুন ফসলকেও উপাসনার যোগ্য ঘোষণা করেছিলেন, এইভাবে গোবর্ধন পুজো থেকে গোপাষ্টমী পর্যন্ত সাত দিনের উৎসবের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। এই সাত দিন ছিল ইন্দ্রের অহঙ্কার ভাঙার সংগ্রামের দিন। যাইহোক, যখন ইন্দ্র পরাজিত হন, তখন ব্রজের লোকেরা এই সাত দিনকে স্মরণ করার জন্য একটি উৎসব উদযাপন করেছিলেন, যার শেষ দিন ছিল গোপাষ্টমী।

গতকাল সকাল ৯:২৩ থেকে আজ ১০:০৬ পর্যন্ত ছিল গোপাষ্টমী পালনের তিথি।
পশ্চিমবঙ্গ জুড়ে ভারতীয় কিষাণ সংঘের পক্ষ গোপাষ্টমী পালন করা হয়।

গোপাষ্টমী পালন প্রসঙ্গে ভারতীয় কিষাণ সংঘের পশ্চিমবঙ্গ প্রান্তের সাধারণ সম্পাদক আশিস সরকার বলেন, ভারতীয় কিষাণ সংঘের চারটি অবশ্য পালনীয় দিনের মধ্যে অন্যতম গোপাষ্টমী পালন। গো-মাতাকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। দেশি গরুর দুধ স্বাস্থ্যের জন্য ভীষণ উপকারী। গরুর গোবর, গোমূত্র চাষের কাজে ব্যবহার করা হয়। আমাদের সুস্থ ভাবে বেঁচে থাকার জন্য গো-মাতার ভূমিকা অপরিসীম। 

ভারতীয় কিষাণ সংঘের পশ্চিমবঙ্গ প্রান্তের প্রচার প্রমুখ ও 'ভারতীয় কিষাণ বার্তা' পত্রিকা সম্পাদক মিলন খামারিয়া বলেন, দেশি গো-মাতা পালন করে তার দুধ, গোবর, গোমূত্র বিক্রি করে আয় করুন। শহরের লোকেরা কিছুজন মিলে একটা জমি কিনে গো-পালন করতে পারেন। তাতে বিশুদ্ধ দুধ খেতে পারবেন। আজকাল কুকুর পোষা আধুনিকা আর গো-মাতা পালন হল প্রাচীন ভাবনা - বলে সমাজের মানুষ অনেকেই ভাবেন। কিন্তু তারা গরুর দুধ বা দুগ্ধজাত সামগ্রী খেয়েই বাঁচেন - তা ভুলে যান। এ বড়ো বেদনার।

পশ্চিমবঙ্গ প্রান্তের সভাপতি অনিমেষ পাহাড়ি বলেন, দেশি গো-মাতা পালন করে দেশি গরুর প্রজাতিকে বাঁচাতে হবে। গোবর, গোমূত্র চাষের কাজে ব্যবহার করে প্রাকৃতিক কৃষিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রাকৃতিক কৃষি ছাড়া কীটনাশক যুক্ত খাবার যে কতটা ক্ষতি করছে তা রাজ্যবাসীর প্রতিনিয়ত মারণ রোগে আক্রান্ত হওয়া প্রমাণ দিচ্ছে। আসুন আমরা সবাই - গো-মাতা পালন করি ও নিজেদের রক্ষা করি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য এই পৃথিবীকে সুরক্ষিত রেখে যায়।

Comments